আতঙ্কে নয়, সতর্কে থাকুন

চারিদিকে এক হিমশিম অবস্থা। এক সীমাহীন আতঙ্কের রাজত্ব। আপনি চান বা না চান গর্তে ঢুকে বসে থাকতে হবে। তাতেও কি রেহাই মিলছে ! অষ্টপ্রহর করোনা ভজনা চলছে – শুধু করোনা আর করোনা। কি করতে হবে, কি করা উচিত – তা নিয়ে নানা মুনির নানা মত। এসময়ে কত যে নতুন বিশেষজ্ঞ তৈরি হয়ে গেল। তা হোন, কিন্তু কেউই কোনো দিশা দিতে পারছেন না। মানুষের জীবন নিয়ে ফাটকা খেলছেন সবাই। তারমধ্যে ভোট বৈতরনীর কারবারিরাও কমবেশি আছেন। আর সঙ্গে আছে ‘সবজান্তা’ কিছু মিডিয়া বা সংবাদমাধ্যমও। এ যেন ক্রিকেটের ২০-২০ ম্যাচ চলছে। ওভারে ওভারে নয়, প্রতি মুহূর্তে মৃত্যুর স্কোরবোর্ড চ্যানেলে চ্যানেলে ঘুরছে। দেশের সব লোকজন এসব দেখেশুনে এতদিনে যে সরাসরি পটলডাঙ্গার টিকিট কেটে ফেলেননি, সেটাই অনেক। তা তাদের বহুজন্মের অর্জিত পূণ্যফলের জন্য কিনা, সেটা ভবিষ্যতদ্রষ্টা ঈশ্বরপ্রতীম ‘বাবাজি’ বা ‘মাতাজি’ বা জ্যোতিষীরা বলতে পারবেন। মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা বলছেন – এক সর্বজনীন বিষাদময়তা গ্রাস করছে আমাদের। বয়স নির্বিশেষে – সবাইকেই। সচেতনতার প্রচার ও প্রসারের নামে চৌদ্দগুষ্টি উদ্ধার হয়ে যাচ্ছে। এতো গেল শুধু করোনা না হওয়ার ঝক্কি। হলে ?

তাঁর বা তাঁদের অবস্থা আরো শোচনীয়। এক অভূতপূর্ব সামাজিক বয়কটের মুখোমুখি হতে হচ্ছে তাঁদের – কমবেশি সবাইকেই।

পাড়া-প্রতিবেশী-পুলিশ-হাসপাতাল-বেশিরভাগের কাছেই তাঁরা অস্পৃশ্য , তাঁরা একঘরে- জল ছোঁয়া বারণ, ছায়া মাড়ানোও অভিশাপ। এর থেকে উদ্ধারের পথ- সত্যিই কি আমাদের জানা নেই ?

হয়তো আছে ! কিন্তু স্পষ্ট করে বলতে চাইছেন না কেউই। অনেকেই এর নেপথ্যে অভিসন্ধির গন্ধও খুঁজে পাচ্ছেন। তাঁরা বলছেন- এর পেছনে রয়েছে রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক স্বার্থসিদ্ধির চেষ্টা। একদিকে, বিভিন্ন ব্যবসায়ী, শিল্পমহল নিজেদের মুনাফা আকাশচুম্বি করার পথে হাঁটছেন। অন্যদিকে রাজনৈতিক মহল সমসাময়িক জ্বলন্ত সমস্যাগুলি থেকে নজর ঘোরানোর জন্যই করোনা অতিমারিকে প্রচারের তুরুপের তাস হিসেবে ব্যবহার করতে চাইছেন। এসব যে অমূলক নয়- তার স্বপক্ষে কিছু যুক্তিও একেবারে ফেলে দেওয়ার মতো নয়।

ডঃ শহীদ জামিলের ভাবনার অনুসারি হয়ে কেউ কেউ (সূত্রঃ সবজান্তা গামছাওয়ালার ডায়েরি : অমিতাভ সেন ) একটা উল্টো অঙ্কও এতদিনে কষে ফেলেছেন।। তাঁরা ICMR- এর Sero Survey- রিপোর্ট ঘেঁটে রীতিমতো আঁক কষে দেখিয়েছেন যে Infection Fatality Rate (IFR) বা করোনা আক্রান্তের মৃত্যুর হারের অনুপাত শহর দিল্লির ক্ষেত্রে প্রথম পর্যায়ে গত মে মাসে ছিল ০.০৮ শতাংশ। সারা দেশের ক্ষেত্রেও IFR ছিল ০.০৮ শতাংশ। গত, ২২ জুলাইয়ের সাম্প্রতিক ICMR -এর রিপোর্টের ভিত্তিতে করা অঙ্ক বলছে দিল্লির সর্বশেষ IFR ০.১ শতাংশ। দেশ ছেড়ে বিদেশের গন্ডি টপকালেও খুব একটা হেলদোল লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। নিউইয়র্ক শহরের করোনা আক্রান্ত ও তাদের মৃত্যুর হারের অনুপাত বিশ্লেষণ করলে বোঝা যাবে সেখানেও IFR- ০.৭ %- এর বেশি নয়। এমনকি Closed case বা যেসব করোনা আক্রান্তের এসপার-ওসপার হয়ে গিয়েছে অর্থাত্ তাঁরা সুস্থ হয়ে গেছেন- নতুবা ইহলোকের মায়া ত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন- তাদের হিসেব পর্যালোচনা করেও দেখা যাচ্ছে , নিউইয়র্কে IFR এখন ০.৭ শতাংশ আর দিল্লির ক্ষেত্রে ০.১৫ শতাংশ। কলকাতার ক্ষেত্রে এখনও কোনো Sero Survey হয়নি। তাই এই নিয়ে কোনো প্রামাণিক বিশ্লেষণ না দেওয়া গেলেও শুধুমাত্র, এযাবত ঘোষিত আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যার অনুপাত থেকে একথা বলা সম্ভব যে, পশ্চিমবঙ্গের এমনকি কলকাতার ক্ষেত্রেও IFR ০.১ শতাংশের আশেপাশেই রয়েছে।

তাহলে কিসের এত ঢক্কানিনাদ ?

কেনই বা লকডাউন নিয়ে এতো শোরগোল ?
কেউ কেউ দু’কদম এগিয়ে ‘ সংক্রমণেই সুসংবাদ’ (সূত্র : ‘সংক্রমণেই সুসংবাদ’ : দেবাশিস লাহা ) দিচ্ছেন। তাঁরা বলছেন, আপনি লকডাউনে থাকুন বা না থাকুন- করোনা ভাইরাসকে আটকানো যাবে না। সে যতই ‘Stay Home, Stay Safe’ মন্ত্র আওড়ান না কেন ! বলছেন- ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া নিয়েই অষ্টপ্রহর ঘর করি আমরা সবাই, সেই সভ্যতার আদিলগ্ন থেকেই । ফ্লু জাতীয় রোগ যেমন অত্যন্ত সংক্রামক,তেমনই মৃত্যুহার নগন্য। তাঁদের মতে, সংক্রমণ যত বাড়বে , ততই আমরা Herd Immunity অর্জন করতে পারবো। লকডাউন এক্ষেত্রে একটা বড়মাপের বাধা। আমাদের দেশে আমরা বহু আগেই এপথে কয়েকধাপ এগিয়ে যেতে পারতাম, যদি না লকডাউনের মত একটি অকিঞ্চিত্কর জোয়াল আমাদের ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়া হত বা এখনও যদি আর না চাপানো হয়। লকডাউন একটি হঠকারি সিদ্ধান্ত। এর পেছনে নাকি আন্তর্জাতিক মহাজনি চক্র , ফার্মা লবি’র হাত আছে। তারা এই Herd Immunity রুখতে চাইছে। যার মূলে অর্থনৈতিক শোষণের অভিসন্ধি। এসব নিয়ে ইউরোপ, আমেরিকায় অনেকেই ইতিমধ্যেই সরব হতে শুরু করেছেন। কেউ কেউ এরজন্য মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বৈজ্ঞানিক উপদেষ্টা, বিশিষ্ট বিজ্ঞানী Antonio Fauci- কেও পরোক্ষে দায়ি করছেন। তাদের মতে Herd Immunity – ই করোনা মুক্তির একমাত্র পথ। যেমন ধরা যাক , অন্যতম ফ্লু রোগ, সোয়াইন ফ্লু-র কথা। সোয়াইন ফ্লু-তে সারা বিশ্বে প্রতি বছর ৬ লক্ষ মানুষ প্রাণ হারান। খোদ আমেরিকাতে ২০০৯-২০১০ এই এক বছরে ৬ কোটিরও বেশি মানুষ সংক্রমিত হয়েছিলেন। মারা যান ১৩ হাজার। এখন এনিয়ে আর কোনো হেলদোল নেই। আমাদের দেশে অনাহার, যক্ষ্মা, ম্যালেরিয়া, নিউমোনিয়াতে প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ মানুষ মারা যান। সোয়াইন ফ্লু-তে আক্রান্তের হিসেব কে রাখে ? তবু কিছু তথ্য বলছে , ২০১৭ থেকে ২০২০-এই ক’বছরে ৫ হাজার মানুষ মারা গেছেন সোয়াইন ফ্লু-তে। আগের সংখ্যা ধরলে তা ১০ হাজার ছাড়িয়ে যাবে। তাহলে, ধনী বিশ্বের দেশে দেশে যা নিয়ে ত্রাহি ত্রাহি রব, আমাদের দেশে তার বাড়বাড়ন্ত আটকাচ্ছে Herd immunity । এমনকি তা কোনো ভ্যাক্সিন না দেওয়া সত্বেও।

আমাদের দেশের মানুষের স্বাভাবিক রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতা – অন্যদেশের মানুষের চেয়ে অনেক বেশি। সেই রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে নষ্ট করে, শুধুমাত্র ওষুধ নির্ভর জীবনযাত্রায় পর্যবসিত করতে চাইছে ফার্মা লবি এবং তাদের বদান্যতায় পুষ্ট চিকিত্সামহল ও অন্যরা।

তাহলে বিষয়টা কি দাঁড়ালো ?

নিশ্চিন্তে থাকুন। মনটা থেকে ভয়টা ঝেড়ে ফেলুন দিকি। আপনার – আমার সকলেরই একদিন করোনা হবে। তা হোক না । ভয় কাটান । আরো বেশি বেঁধে বেঁধে থাকুন । পরস্পরের পাশে থাকুন । পাশে দাঁড়ান । এই রোগের ভয়, রোগটার থেকে হাজার গুন খারাপ । নিজের স্বাস্থ্যের দিকে খেয়াল রাখুন । সুস্থ থাকুন ।
ভয় পাওয়া বন্ধ হোক ।
ভয় পাওয়ানো বন্ধ হোক ।।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *